এ প্রস্তাব অনুমোদন পেলে ইউনিটপ্রতি দাম ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়বে। খুচরা পর্যায়েও বিভিন্ন শ্রেণীর গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম ১৫ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে ছয় বিতরণ কোম্পানি। রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে গতকাল আয়োজিত গণশুনানিতে দাম বাড়ানোর এ প্রস্তাব দেয়া হয়।
গণশুনানিতে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন শিল্প উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, ভোক্তা অধিকার সংগঠন থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকরা। অনেকে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গণশত্রুতে পরিণত হবে। কেউ কেউ অভিযোগ করেন যে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের নামে বারবার গণশুনানির মাধ্যমে মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে।
মূল্যবৃদ্ধির বিরোধিতাকারীরা বলেন, বিদ্যুৎ খাতের অদক্ষতা ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার দায় সাধারণ জনগণের ওপর চাপিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এরই মধ্যে জ্বালানি তেল, গ্যাসসহ বিভিন্ন জ্বালানি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়বে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে শিল্প ও বাণিজ্য খাতে। বিশেষ করে দেশের শিল্প-কারখানাগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে জনগণের ওপর নতুন করে আর্থিক চাপ সৃষ্টি হবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
দেশের বিদ্যুতের একক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান বিপিডিবি। সরকারি, বেসরকারি ও যৌথ মালিকানাধীন বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সংস্থাটি বিদ্যুৎ কিনে বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানির কাছে সরবরাহ করে থাকে। পাশাপাশি ভারত ও নেপাল থেকেও বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়। তবে বিদ্যুৎ ক্রয় ও সরবরাহ প্রক্রিয়ায় প্রতি বছর বিপুল আর্থিক ঘাটতির মুখে পড়ছে বিপিডিবি। সরকারি ভর্তুকি পাওয়ার পরও সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না। এ অবস্থার পেছনে কাঠামোগত সংকট, দুর্বল পরিকল্পনা ও অকার্যকর বিদ্যুৎ ক্রয়নীতিই প্রধানত দায়ী বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
বিইআরসিতে জমা দেয়া বিপিডিবির প্রস্তাব থেকে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের বিপরীতে সরকার প্রায় ৫ টাকা ৪৭ পয়সা ভর্তুকি দিচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে। আর প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১২ টাকা ৯১ পয়সায়। তবে বিইআরসির টেকনিক্যাল ইভ্যালুয়েশন কমিটির (টিইসি) মতে, উৎপাদন ব্যয় হতে পারে ১ লাখ ২৬ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। বর্তমান ট্যারিফ কাঠামো অনুযায়ী, সম্ভাব্য আয় হবে ৭৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় ৬৫ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনতে সংস্থাটির ইউনিটপ্রতি ব্যয় (কিলোওয়াট ঘণ্টা) ছিল গড়ে ১১ টাকা ৮৩ পয়সা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রাক্কলিত ব্যয়ে ইউনিটপ্রতি ব্যয় বেড়ে ১২ টাকা ৩ পয়সায় গিয়ে দাঁড়াবে। একইভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি ব্যয় হবে (প্রাক্কলিত) ১২ টাকা ৫৩ পয়সা। বিপিডিবির বর্তমানে পাইকারি বিদ্যুতের (বাল্ক) মূল্যহার রয়েছে ৭ টাকা ৪ পয়সা। এ দাম ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর রয়েছে।
সংস্থাটি বলছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি মূল্যহার বৃদ্ধি এবং বিদ্যমান বাল্ক মূল্যহার ঘাটতির কারণে তারা পাইকারি মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ করার প্রস্তাব দিয়েছে। এতে সংস্থাটি ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়িয়ে নিতে চায় বিইআরসির মাধ্যমে।
দুই দিনব্যাপী গণশুনানির গতকাল ছিল প্রথম দিন। গণশুনানিতে বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘গত দুই বছরের বেশি সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি তেল, গ্যাস, কয়লার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানিগুলোর জ্বালানির বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এসব জ্বালানির মূল্য অনেক ক্ষেত্রে ডলারে পরিশোধ করতে হয়। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর আর বিদ্যুতের কোনো মূল্য বৃদ্ধি করা হয়নি। প্রস্তাবিত মূল্যবৃদ্ধির এ লক্ষ্য কোনোভাবেই পুরো খাতকে ব্রেক-ইভেনে নেয়া নয়। বরং বিপুল ভর্তুকির একটি অংশ সমন্বয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
বিপিডিবির দেয়া হিসাবে বিদ্যুৎ খাতের বর্তমানে ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা, যদিও বিইআরসির হিসাবে এ ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা। বিপিডিবির চেয়ারম্যান দাবি করেন, প্রস্তাবিত সমন্বয়ের মাধ্যমে হয়তো মোট ভর্তুকির এক-পঞ্চমাংশ বা এক-চতুর্থাংশ কমানো সম্ভব হবে, কিন্তু বাকি অংশ সরকারকেই বহন করতে হবে।
গণশুনানিতে বিপিডিবির চেয়ারম্যান বলেন, ‘ট্রান্সমিশন লসের বিষয়টিও বিপিডিবিকে বহন করতে হচ্ছে। বিপিডিবি প্রকৃত সিস্টেম লস ৩ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ ধরে হিসাব করেছে, যেখানে বিইআরসির টেকনিক্যাল কমিটি ২ দশমিক ৭ শতাংশ বিবেচনা করেছে। বর্তমানে মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে যথাযথ জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে উৎপাদনে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। সরকারের পক্ষেও প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি বহন করা কঠিন। এ কারণে একটি “চেক অ্যান্ড ব্যালান্স” তৈরি করতেই মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব আনা হয়েছে।’
গণশুনানিতে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হলে বিইআরসি “গণশত্রুতে” পরিণত হবে। মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে বারবার বলা হচ্ছে, সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। কিন্তু সরকার তো জনগণের টাকাতেই ভর্তুকি দেয়। সবাই সরকারের মুনাফার কথা ভাবছে, অথচ মানুষের কষ্টের কথা কেউ ভাবছে না।’
পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ২১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে বিপিডিবি। কারিগরি কমিটি বলেছে, বর্তমান দামে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রতি ইউনিটে বিপিডিবির ঘাটতি হবে ৫ টাকা ৪৭ পয়সা। এটি মেটাতে হলে গড়ে ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ দাম বাড়ানো প্রয়োজন। তবে আগের ধারাবাহিকতায় সরকারের ভর্তুকি বিবেচনায় নিয়ে মূল্যহার নির্ধারণ করা যেতে পারে। বর্তমান দামে বিপিডিবির ঘাটতি হতে পারে প্রায় ৬০ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এ ঘাটতির প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫৬ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা।
মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন শিল্পোদ্যোক্তারাও। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন মিয়া বলেন, ‘এ মুহূর্তে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি হবে “মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা”। বর্তমানে দেশের রফতানি খাত নিম্নমুখী অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে শিল্প খাত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারাবে। একসময় তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশ চীনের পরই ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই অবস্থান দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। তাই কোনো অবস্থাতেই বিদ্যুতের মূল্যহার বাড়ানোর সুযোগ নেই।’
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স গণশুনানিতে বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্প-কারখানার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে এবং ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। বিপিডিবির মূল্যবৃদ্ধির সুপারিশে জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করা হয়নি।’ গণশুনানি বাতিলের দাবি জানান তিনি।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘বর্তমান বিদ্যুৎ নীতিমালায় কিছু পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে এবং সরকার এ বিষয়ে কাজ করছে। বিপিডিবির দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনা জরুরি। বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতে কর্মরত প্রকৌশলীদের প্রচলিত ধারণা বদলাতে হবে। কারণ বিশ্বব্যাপী বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ইউরোপের অনেক দেশ এরই মধ্যে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় চলে গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে মোট বিদ্যুতের প্রায় ৫০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে। ভারতে শুধু সৌরবিদ্যুৎ ২০ শতাংশের বেশি এবং বায়ুবিদ্যুৎ ১০ শতাংশের বেশি। পাকিস্তানেও সৌরবিদ্যুতের অংশ ৩০ শতাংশের বেশি।’
গণশুনানি আয়োজনে গতকাল দুপুরের পর দেশের একমাত্র সঞ্চালন সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি বিদ্যুৎ সঞ্চালন চার্জ ৩০-৩১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪৮-৪৯ পয়সা করার প্রস্তাব দেয়। কোম্পানিটি গত তিন অর্থবছর ধারাবাহিকভাবে নিট লোকসানে রয়েছে। কোম্পানিটির দেশী-বিদেশী ঋণের পরিমাণ এখন প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। বিইআরসিতে দেয়া প্রস্তাবে কোম্পানিটি জানিয়েছে, হুইলিং চার্জ না বাড়ালে কোম্পানি পরিচালনা, ঋণ ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন ঝুঁকিতে পড়বে বলে।